নাগরিক রিপোর্ট : দূর্ঘটনায় পতিত বাস যমুনা লাইনের আহত যাত্রী মো. আবুল কালাম (৩০) ও মিলন দাস (৩৪) বলেন, শনিবার রাত ১০টায় বাসটি সাভার থেকে পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। পথে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরের কোন স্থানে বাসটিতে যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দিলে প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় লাগে গোলাযোগ সারাতে। ভোররাত সাড়ে ৩টায় ফেরী পাড় হয়ে চালক অসম্ভব বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিলেন।
আবুল কালাম কালু বলেন, ‘বেপরোয়া গতির কারনে আমরা যাত্রীরা আতংকিত হয়ে পড়ি। পেছনের যাত্রীরা ভয়ে একাধিকবার ডাক চিৎকারও দেন গাড়ি আস্তে চালানোর জন্য। কিন্ত চালক আমাদের কথা শোনেনি। আবুল কালাম কালু পিরোজপুরের নেছারাবাদ যাওয়ার জন্য সাভার থেকে বাসটিতে উঠেছিলেন। আর ১৫ মিনিট পর তার বরিশালের গড়িয়ারপাড় নামার কথা ছিল। কিন্ত তার আগেই মর্মান্তিক দূর্ঘটনায় পতিত হয় বাসটি। হাত-পা ভেঙ্গে আবুল কালাম বরিশাল শের ই বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
বরিশাল নগরের সদর রোডের বাসিন্দা মিলন দাস (৩৪) যমুনা লাইনের যাত্রী ছিলেন। গুরুতর আহত হয়ে তিনি শেবাচিমে চিকিৎসাধীন। মিলন দাস বলেন, ‘তখন ভোর রাত। বাইরে অন্ধকার ও বৃষ্টি। অধিকাংশ যাত্রীরা ছিলেন ঘুমে। হঠাৎ বিকট আওয়াজ। বাসটির মাঝ বরাবর রাস্তার পাশের গাছের মধ্যে ঢুকে যায়। যাত্রীদের আর্তনাদ, আহাজারি। আশেপাশে তেমন কেউ ছিলোনা। প্রায় আধাঘন্টা পর দূর্ঘটনা কবলিত বাসটির যাত্রীদের উদ্ধারে লোকজন আসে’।
মিলন দাস বলেন, ‘আমি বাসের মাঝামাঝি জানালার পাশে বসে ছিলাম। গাছের সঙ্গে ধাক্কা লাগার পর জানালা ভেঙ্গে ছিটকে বাইরে পড়ে যাই। চালকের বেপরোয়া গতির কারনেই এই মর্মান্তিক দূর্ঘটনা ঘটেছে’।
ওই দুই যাত্রীর মতো গৌরনদী হাইওয়ে থানার পরিদর্শক বেল্লাল হোসেনও বলেছেন, বেপরোয়া গতির কারনেই যমুনা লাইনের বাসটি দূর্ঘটনায় পতিত হয়েছে।
সন্তান নেই মা জানেন না
ঝালকাঠী সদর উপজেলার মানপাশা গ্রামের মনির হোসেন দুবাই থাকেন। তার স্ত্রী আখি আক্তার (৩০) ও দুই সন্তান আরাফাত (৯) এবং মরিয়ম (৩) মায়ের সঙ্গে বাড়িতেই থাকতেন। গত মঙ্গলবার আখি আক্তার ছেলে আরাফাত ও মেয়ে মরিয়মকে নিয়ে সাভার বেড়াতে গিয়েছিলেন ভাই আব্দুস সালামের বাসায়। শনিবার যমুনা লাইনের বাসটিতে দুই সন্তান নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন আখি আক্তার। কিন্ত ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আখি আক্তার ৩ বছরের মেয়ে মরিয়মসহ এখন শেবাচিম হাসপতাালে। একমাত্র ছেলে আরাফাত বেচে নেই। একমাত্র ছেলে বেচে নেই তা জানানো হয়নি মা আখি আক্তারকে।
আখি আক্তারের ভাই মো. সালেক কাদতে কাদতে বলেন, ‘পোলা নাই, হ্যা মোর বইনেরে জানাই নাই, জানলে বুইনডাও বাঁচবেনা। ও আল্লা এই সর্বনাশ ক্যা অইলো’।
বাবা নেই জানেন না ছেলে
ছেলে অনীক শীলকে (১৬) নিয়ে শনিবার সকালে মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কদমবাড়িতে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন উজিরপুরের মুন্ডুপাশা গ্রামের মাধব শীল (৫০)। সঙ্গে ছিলেন একই বাড়ির আরও ৪ জন। রোববার রাতে ছেলে অনীকসহ অন্যান্যদের নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন মাধব শীল। কিন্ত বামরাইলের দূর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে শেবাচিম হাসপাতালে মারা গেছেন মাধব শীল। আহত অবস্থায় ছেলে অনীক শীল শেবাচিমে চিকিৎসাধীন। বাবা যে নেই তা জানানো হয়নি অনীককে।
স্বামী হারিয়ে পাগল প্রায় মাধব শীলের স্ত্রী মঞ্জু শীল (৪০)। হাসপতালের বারান্দায় আহাজারি করতে করতে মঞ্জু শীল বলেন, ‘ছেলে নিয়ে গেছিলো ধর্মীয় কাজে, ভগবান তুমি আমার একি সর্বনাশ করলা। আমি এহন কি নিয়া বাঁচমু।
ঘুমিয়ে পড়েছিলো চালক!
বামরাইলে যমুনা লাইনের বাসটি দূর্ঘটনায় পতিত হওয়ার কারন হিসাবে চালক ঘুমিয়ে পড়েছিলো বলে মনে করছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের এক কর্মকর্তা।
বরিশাল ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক বেলাল উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে ধারনা করছি চালক ঘুমিয়ে পড়েছিল। আর সে কারনেই নিয়ন্ত্রন হারিয়ে বাসটি গাছের ওপর আছড়ে পড়ে। এতে বাসটি দুমড়েমুচরে যায়।
উল্লেখ্য, ঢাকা থেকে ভান্ডারিয়াগামী যমুনা লাইন পরিবহন নামক বাসটি রোববার ভোর সাড়ে ৫টায় বরিশালে উজিরপুর উপজেলার বামরইল নামক স্থানে নিয়ন্ত্রন হারিয়ে সড়কের পাশে মেহগণি গাছের ওপর আছড়ে পড়ে। এ দূর্ঘটনায় এ পর্যন্ত ১১ জন নিহত হয়েছেন। আহত ২৫ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ##
