পুলক চ্যাটার্জি, অতিথি প্রতিবেদক ॥ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ববি) ছাত্রলীগের কমিটি নেই। তবে গত ৩-৪ বছর ধরে ববিতে স্ব-ঘোষিত ছাত্রলীগ নেতারা সরব। ৪টি গ্রুপে বিভক্ত ববিতে ছাত্রলীগের মধ্যে আধিপত্যের দ্বন্দ্বও প্রকট। এদের মধ্যে একটি গ্রুপের প্রধান মহিউদ্দিন আহম্মেদ শিফাতের নানান নেতিবাচক কর্মকান্ডে বিব্রত স্থানীয় শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতারা।
বরিশালের এক বিএনপি নেতার পুত্র মহিউদ্দিন আহম্মেদ শিফাত ছাত্রলীগের নামে ক্যাম্পাস এবং ক্যাম্পাসের বাইরে চালাচ্ছেন বিতর্কিত কর্মকান্ড। অভিযোগ আছে শিফাতের ইশারায় বুধবার সন্ধ্যায় ক্যাম্পাস সংলগ্ন বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক অবরোধ করেন তার অনুসারিরা। এতে ওই সড়কে ৩ ঘণ্টা সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে। ফলে দুর্ভোগে পড়তে হয় হাজার হাজার মানুষের। একই দিন শিফাতের অনুসারিরা রূপাতলি বাস টার্মিনালে একটি কাউন্টার ও শ্রমিক ইউনিয়ন নেতার কার্যালয় ভাংচুর করেন। এমন পরিস্থিতিতে বরিশাল জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা সাংগঠনিক পরিচয়বিহীন মহিউদ্দিন আহম্মেদ শিফাতের বিরুদ্ধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ কামনা করেছেন।
বরিশাল নগরীর আমানতগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা মহিউদ্দিন আহম্মেদ শিফাত ববি’র বঙ্গবন্ধু হলের ৩০০৫ নম্বর কক্ষে আবাসিক ছাত্র। অভিযোগ আছে নগরীর বাসিন্দা হয়েও হলের সিটটি তিনি প্রভাব খাটিয়ে নিয়েছেন। বুধবার বিকেলে ববি ক্যাম্পাসের অদূরে রূপাতলি বাস টার্মিনালে শিফাতের সঙ্গে বিরোধ হয় বাস শ্রমিকদের। তার জের ধরে ওই দিন সন্ধ্যায় ছাত্রলীগ নামধারী শিফাতের অনুসারিরা রূপাতলি বাস টার্মিনালে গিয়ে বাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সুলতান মাহমুদের কার্যালয় ও বাকেরগঞ্জের বাস কাউন্টিার ভাংচুর করে। বরিশাল-পটুয়াখালী বাস মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিন উদ্দিন জানান, হামলার সময় মালিক সমিতির তিন কর্মচারী শাহিন, আল মামুন ও ছালাম আকনকে বেধরক মারধর করা হয়। খবর পেয়ে কোতয়ালী মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। তবে মহিউদ্দিন শিফাত অভিযোগ করেছেন, বুধবার বিকেলে তিনি ক্যাম্পাসে যাওয়ার জন্য একটি মাহিন্দ্রায় (থ্রি-হুইলার) বসেছিলেন। ববি’র একাধিক ছাত্রীও ছিল ওই মাহিন্দ্রায়। তখন এক বাস শ্রমিক লাঠি দিয়ে মাহিন্দ্রাটির পিছনে জোরে আঘাত করলে ছাত্রীরা ভয়ে চিৎকার দিয়ে ওঠেন। তখন তিনি (শিফাত) ওই ঘটনার প্রতিবাদ জানালে শ্রমিকরা চরম দুর্ব্যবহার করেন। এ নিয়ে বাস শ্রমিকদের সঙ্গে তার বিতর্ক হয়েছে।
এক পর্যায়ে বাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সুলতান মাহমুদ ঘটনাস্থলে গিয়ে মহিউদ্দিন আহম্মেদ শিফাতকে তার কার্যালয়ে নিয়ে যান। তখন শিফাতের অনুসারি ববি শিক্ষার্থীরা শ্রমিক ইউনিয়ন সাধারণ সম্পাদকের কার্যালয়ে হামলা চালান। পরবর্তিতে ভাড়া নিয়ে এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে দ্বন্দ্বের জের ধরে শিফাতের অনুসারিরা বাকেরগঞ্জ রুটের বাস কাউন্টিার ভাংচুর করেন। কাউন্টার ভাংচুরের সত্যতা স্বীকার করে মহিউদ্দিন শিফাত বলেন, “হাফ” ভাড়া দিতে চাওয়ায় ববি’র এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে ওই কাউন্টারের লোকজন দুর্ব্যবহার করলে ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। তবে ইউনিয়ন নেতার কার্যালয় হামলার অভিযোগ অসত্য বলে দাবি করেছেন শিফাত। কিন্তু শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সুলতান মাহমুদ বলেছেন, শ্রমিকদের সঙ্গে শিফাতের ঝগড়া চলার সময় তিনি শিফাতকে তার কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়ার পর ববি শিক্ষার্থীরা তার কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করেছেন। পরে একটি বা কাউন্টারও তারা ভাংচুর করে।
এদিকে বুধবার সন্ধ্যায় বাস টার্মিনালে পুলিশ যাওয়ার পর মহিউদ্দিন শিফাত তার অনুসারিদের নিয়ে ক্যাম্পাসে ফিরে গিয়ে ববি সংলগ্ন বলিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক অবরোধ করেন। এতে সন্ধ্যা ৭ টা থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত ওই মহাসড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে। শিফাতের দাবি সাধারণ শিক্ষার্থীরা বাস শ্রমিকদের দুর্ব্যবহার ও জুলুমের প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ করেছিলেন। বাস মালিক সমিতি সূত্র জানায়, বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের এক নেতার হস্তক্ষেপে শিফাত অনুসারিরা রাত ১০ টায় অবরোধ তুলে নেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্ব-ঘোষিত নেতা মহিউদ্দিন আহম্মেদ শিফাত ছাত্রলীগের নাম ব্যবহার করে রূপাতলি বাস টার্মিনাল থেকে ববি ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের যাতায়তের জন্য ১৫টি মাহিন্দ্রায় বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো লাগিয়ে গিয়েছেন। প্রায় ৩ মাস ধরে শিফাতের নির্ধারিত ওই মাহিন্দ্রাগুলো রূপাতলি থেকে ববি ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের আনা নেওয়া করছে। অভিযোগ আছে ওই ১৫ মাহিন্দ্রা থেকে মাসোহারা পান শিফাত। তবে শিফাতের দাবি শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে সুবিধার জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে তিনি নির্ধারিত মাহিন্দ্রা চলাচলের উদ্যোগ নিয়েছেন। মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ অসত্য।
এদিকে ক্যাম্পাসের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানা গেছে, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক বছর ধরে ছাত্রলীগের ৪টি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। গ্রুপগুলো হচ্ছে মহিউদ্দিন শিফাত গ্রুপ, ইমন-জিসান গ্রুপ, জাহিদ-রক্তিম গ্রুপ ও আল- আমিন গ্রুপ। সূত্র জানায় এ ৪ গ্রুপের মধ্যে শিফাত গ্রুপ ক্যাম্পাসে একক আধিপত্য বিস্তার করে আছে। নগরীর বাসিন্দা হওয়ায় ক্যাম্পাসের বাইরেও শিফাতের বিপুল প্রভাব। অপর ৩ গ্রুপ ক্যাম্পাসের সক্রিয় থাকলেও তারা তেমন সরব নয়।
সূত্র জানায়, মহিউদ্দিন শিফাত গত মার্চ মাসের শেষে শুরু হওয়া ববি’র ভিসি বিরোধী আন্দোলনের পর থেকে নিজের আধিপত্য বিস্তারের বিপরোয়া হয়ে ওঠেন। তখন ভিসি বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব এবং গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার দায়ে ক্যাম্পাস ভিত্তিক সংগঠন একাত্তরের চেতনার সভাপতি লোকমান হোসেনের ওপর শিফাত ও তার অনুসারিরা হামলা চালায়। বিষয়টি নিয়ে তখন ক্যাম্পাস এবং স্থানীয় আওয়ামী রাজনীতিতে ব্যাপক তোলপাড় হয়। লোকমানের ওপর হামলার ঘটনার শিফাতকে কোন শাস্তি ভোগ করতে না হওয়ায় সে আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। অভিযোগ আছে আবাসিক ও অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের দলে ভেড়াতে তাদের ওপর জোর জবরদস্তি করেন শিফাতা অনুসারিরা। এজন্য হিসাববিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষার্থীকে মারধরও করা হয়। ক্যাম্পাসে অবস্থান করে মহিউদ্দিন শিফাত তার অনুসারিদের দিয়ে ববি’র আশপাশের শিক্ষার্থী মেসের মালিকদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা তোলেন বলে অভিযোগ আছে। শেরেবাংলা হলের একটি কক্ষে (১০০১ নম্বর কক্ষ) শিফাতের সহযোগীরা নিয়মিত মাদকের আসর বসায় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সম্প্রতি আরাফাত নামের ববি’র এক শিক্ষার্থীকে পুলিশ মাদকসহ ক্যাম্পাস থেকে গ্রেফতার করে। তখন আরাফাত নিজেকে শিফাতের অনুসারি বলে পুলিশের কাছে পরিচয় দিয়েছিল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছাত্রলীগের ওপর ৩ গ্রুপের একাধিক সদস্য জানিয়েছেন, মহানগর আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতার প্রশ্রয়ে মহিউদ্দিন আহম্মেদ শিফাত দিনে দিনে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। তার কর্মকান্ডে ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন ও মনগড়া দাবি করে মহিউদ্দিন শিফাত বলেছেন, ঈর্ষার্ণীত হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিরা তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচাপর চালাচ্ছেন। তিনি (শিফাত) চাঁদাবাজি বা মদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন। শিক্ষার্থীদের সুবিধা-অসুবিধা দেখতে এবং ক্যাম্পাসে যাতে কোন সরকার বিরোধী কর্মকান্ড না হয় সেজন্য তিনি হলে থাকেন।
ববি’র স্ব-ঘোষিত ছাত্রলীগ নেতা মহিউদ্দিন শিফাতের কর্মকান্ড নিয়ে বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট তালুকদার মোঃ ইউনুস এবং মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট গোলাম আব্বাস চৌধুরী দুলাল ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তালুকদার মোঃ ইউনুস বলেছেন, ছাত্রলীগের নামে হামলা-ভাংচুর ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে এমন কর্মকান্ড গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তিনি বলেন, যাদের সাংগঠনিক পরিচয় নেই তারা অন্যায়-অপরাধ করলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উচিত যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া। মহানগর সভাপতি অ্যাডভোকেট গোলাম আব্বাস চৌধুরী দুলাল বলেন, তুচ্ছ ঘটনায় বাস টার্মিনালে হামলা ভাংচুর ও সড়ক অবরোধ দলের জন্য বিব্রতকর। ছাত্রলীগের নামে এ ধরনের কর্মকান্ড নিন্দনীয়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অবশ্যই এ ধরনের বেআইনী কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবেন বলে তিনি আশা করেন। ##
২০১৯-০৯-২১
