নাগরিক রিপোর্ট ॥ ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ এর আঘাতে বরিশালে এক নারী নিহত হয়েছেন। বিধ্বস্ত হয়েছে ৩ সহস্রাধিক কাচাঁ ঘর। জমির ফসল মারাতœকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। রেকর্ডভাঙ্গা বৃষ্টিতে নগরীর কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। বসতবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ায় এবং একটানা ৩০ ঘন্টা বিদ্যুৎ না থাকায় মহাদূর্ভোগে পড়তে হয় নগরবাসীকে। মোবাইল ও ইন্টারন্টেট নেটওয়ার্ক না থাকায় যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন ছিল। সোমবার দুপুর নাগাদ নগরীর কিছু কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক স্বাভাবিক হয়।
বরিশাল জেলা প্রশাসনের ক্ষয়ক্ষতির তালিকা অনুযায়ী জেলার ১০ উপজেলায় ৩ হাজার ৫০টি কাঁচাবাড়ি বিধ্বস্ত, ১ লাখ হেক্টর জমির আমন ধান, ৬ হাজার হেক্টর রবিশষ্য, ১ লাখ গাছপালা, ১২০ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক এবং ২২ কিলোমিটার বেরীবাঁধ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। জেলা প্রশাসনের ক্ষয়ক্ষতির তালিকা অনুযায়ী ঝড়ে জেলায় ৫০টি প্রাথমিক ও ২০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো বিধ্বস্ত হয়েছে। ৪৩৫টি ঘের ও পুকুর ডুবে মাছ ভেসে গেছে।
রোববার দুপুরে বরিশালের ওপর দিয়ে প্রবল বেগে বয়ে যায় ঘূর্নিঝড় বুলবুল। স্থানীয় আবহাওয়া অফিসের দেয়া তথ্যমতে বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর সোয়া ১২টা পর্যন্ত কয়েকদফায় দমকা বাতাস বয়ে যায়। এসময় বাতাসের গতিবেগ সর্বোচ্চ ৮৬ কিলোমিটার পর্যন্ত উঠেছিল। তার আগে ভোর ৪টা থেকেই শুরু হয় মুশলধারার বৃষ্টি। যা অব্যাহত থাকে বেলা দেড়টা পর্যন্ত।
বরিশাল আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র পর্যবেক্ষক মো. মিলন হাওলাদার জানান, বুলবুলের প্রভাবে রোববার বিকাল ৩টা পর্যন্ত ৩০২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এটা ২৪ ঘন্টায় বরিশালে সর্বোচ্চ পরিমান বৃষ্টি। এরআগে সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয়েছিল ২০১৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর আগষ্ট ২৭২ মিলিমিটার। সেদিন ৪৯ বছর আগের ২৫৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের রেকর্ড ভঙ্গ হয়েছিল।
ঘূর্ণিঝড়ে জেলার উজিরপুর পৌর শহরের ১ নম্বর ওয়ার্ডের মাদারশী এলাকায় ঘরের উপর গাছ চাপা পড়ে আশালতা মজুমদার (৬৫) নামে এক বৃদ্ধা মারা যান। নিহত আশালতা মজুমদার ওই এলাকার দীজেন্দ্র নাথ মজুমদারের স্ত্রী। উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুমা আক্তার এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। বিভিন্ন এলাকায় অগণিত গাছপালা উপড়ে গেছে। বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নগরজীবন দূবিসহ হয়ে উঠে। বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয় বরিশাল নগরীতে। সোমবার দুপুর নাগাদ নগরীর সড়কগুলো থেকে পানি সরে গেলেও এখনও নিচু আবাসিক এলাকার বাসিন্দারা একপ্রকার জলবন্দী। নগরীর স্ব রোডের বাসিন্দা ব্যাংকার মাসুদ আহমেদ জানান, মধ্যরাত থেকে বিদ্যুৎ বিচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। আসপাশের রাস্তাঘাট পানিতে ডুবে যায়।
জেলার মেঘনা ঘেরা হিজলা, মেহেন্দগিঞ্জ ছাড়াও মুলাদী, বাবুগঞ্জ, বানারীপাড়া, বাকেরগঞ্জে বুলবুল এর আঘাতে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ভারি বর্ষনে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে যায়। হিজলার সংবাদকর্মী হুমায়ুন কবির জানান, বৃস্টিতে ফসলীজমি ডুবে গেছে। অনেক স্থানে গাছপালা পড়ে ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। হিজলাসহ পার্শবর্তী মুলাদী, মেহেন্দীগঞ্জে এখনও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হয়নি ।
এদিকে রোববার দুপুরে তীব্র ঝড়ের সময় মেঘনা নদীতে ড্রেজিংরত অবস্থায় বিপদগ্রস্থ ৩০জন শ্রমিকক ‘৯৯৯’র এর মাধ্যমে সহায়তা চাইলে সন্ধ্যায় উদ্ধার করে হিজলা থানা ও নৌ পুলিশ এবং কোস্টগার্ড। হিজলা থানার ওসি অসীম কুমার সিকদার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
বরিশাল নদী বন্দর কর্মকর্তা আজমল হুদা মিঠু সরকার জানান, ৩ দিন বন্ধ থাকার পর সোমবার সকাল ১০টার থেকে বরিশালের সঙ্গে সারাদেশে সকল ধরনের নৌ যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়েছে।
বুলবুলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্থদের পূনাঙ্গ তালিকা করে দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের উপযুক্ত সহায়তা দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছেন বরিশালের জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমান।

