নাগরিক রিপোর্ট : বাংলদেশ বেতার বরিশাল কেন্দ্রের অনিয়মিত কর্মচারী (প্রযোজনা সহকারী) মো. মনিরুল ইসলাম অন্যান্য দিনের মতো গত ৩ ডিসেম্বরও (মঙ্গলবার) কর্মব্যস্ততায় কাটিয়েছেন। বিকাল ৪টার দিকে বাড়িতে ফেরার আগ মুহুর্তে তার কক্ষে আসেন কেন্দ্রের আঞ্চলিক পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. আনসারউদ্দিন। তিনি মনিরুলকে বলেন, ‘কাল (বুধবার) থেকে আর অফিসে আসবেন না’। সেখানকার আরও ৫ জন কর্মচারীকে একই কথা বলেন আঞ্চলিক পরিচালক। কাউকে মুখোমুখি, যাকে সামনে পাননি তাকে মুঠোফোনে শোনানো হয়েছে এ কথা। দেশের ৬টি বেতার কেন্দ্রে কর্মরত ৮০ জন কর্মচারীকে ৩ ডিসেম্বর বিকালে সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছ থেকে একই কথা শুনতে হয়েছে। অনিয়মিতদের চাকুরীচ্যুত করতে উচ্চাদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকায় তাদেরকে কর্মস্থলে না আসতে মৌখিক নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
কি কারনে তারা চাকুরীচ্যুত হলেন- বিষয়টি এখন পর্যন্ত জানতে পারেননি এসব কর্মচারীরা। তাদের মধ্যে অনেকে ২০ বছরেরও বেশী বেতার কেন্দ্রে অনিয়মিত হিসাবে কাজ করে আসছিলেন।
বরিশাল বেতারে চাকুরীচ্যুত ৬ জন বৃহস্পতিবার বরিশাল প্রেসক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলন করে চাকুরী হারানোর কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। মধ্যবয়সে চাকুরী হারিয়ে তারা পরিবার-পরিজনের জীবন-জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।
অভিযোগ উঠেছে, বাংলাদেশ বেতারে চলমান নিয়োগ প্রক্রিয়ায় লাখ লাখ টাকা নিয়োগ বানিজ্য করার জন্যই অনিয়মিতদের কৌশলগতভাবে মৌখিক নির্দেশে চাকুরীচ্যুত করা হচ্ছে। এজন্য প্রথমে টার্গেট করা হয়েছে চাকুরী স্থায়ী করার দাবীতে উচ্চাদালতে রীট করা ৮০ জনকে।
তবে ৮০ জনকে চাকুরীচ্যুত করার অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন বাংলাদেশ বেতারের মহাপরিচালক নারায়ন চন্দ্র শীল। তিনি বলেন, “তাদের কে সাময়িক সময়ের জন্য কাজে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। বাজেট স্বল্পতা থাকায় উর্ধ্বতন মহল থেকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে”। এরবেশী কিছু বলতে তিনি অস্বীকৃতি জানান। মহাপরিচালক স্বীকার করেন, অনিয়মিত কর্মচারীদের চাকুরীচ্যুত না করার জন্য উচ্চদালতের নির্দেশ আছে।
বাংলাদেশ বেতার সুত্রে জানা গেছে, দেশের সবগুলো বেতার কেন্দ্রে প্রায় ৬০০ অনিয়মিত কর্মচারী রয়েছেন। শিল্পী খাত থেকে তাদেরকে বেতন দিয়ে কেন্দ্রে প্রশাসনিক কাজ করানো হয়। শিল্পী হিসাবে তাদেরকে রাজস্বখাতে অন্তর্ভূক্তির দাবী জানিয়ে ৮০ জনের রীট উচ্চাদালতে এখনও চলমান। শুধুমাত্র রীট করায় ওই ৮০ জনকে ৩ ডিসেম্বর একযোগে কর্মস্থলে আসতে মৌখিক নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
তারমধ্যে ঢাকা কেন্দ্রে ৮ জন, বরিশাল কেন্দ্রে ৬ জন, খুলনা কেন্দ্রে ২ জন, রাজশাহী কেন্দ্রে ২৫ জন, কক্সবাজার কেন্দ্রে ৩০ জন ও রংপুর কেন্দ্রে ৭ জন সহ আরও ২ জন রয়েছেন। শিল্পী ভাতা থেকে ৭ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা বেতন পেতেন বলে চাকুরীচ্যুতরা জানান।
বরিশাল বেতার কেন্দ্রের চাকুরীচ্যুত মনিরুল ইসলাম রীট আবেদনকারী ৮০ জনের মধ্যে অন্যতম। তিনি বলেন, রীটের নিস্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অনিয়মিত কর্মচারীদের চাকুরীচ্যুত না করার জন্য উচ্চাদালতের নির্দেশ রয়েছে। এ প্রেক্ষিতে বেতারের সদর দপ্তরের উপ পরিচালক মোহাম্মদ হামিদুর রহমান (প্রশাসন ও অর্থ) গত ৩ মার্চ অনিয়মিত ৬০০ কর্মচারীকে চাকুরীচ্যুত না করার জন্য বেতারের সকল কেন্দ্রসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে চিঠি দেন।
এরকম চিঠি পাওয়ার পরও বরিশাল বেতার কেন্দ্র থেকে ৬ জনকে কেন চাকুরীচ্যুত করা হলো জানতে চাইলে আঞ্চলিক পরিচালক মো. আনসার উদ্দিন বলেন, “কেউ চাকুরীচ্যুত হননি, তাদেরকে কর্মবিরতীতে রাখা হয়েছে”। উর্ধ্বতন মহলের নির্দেশে এ আদেশ দিয়েছেন বলে আঞ্চলিক পরিচালক বলেন।
রাজস্বখাতের অন্তর্ভূক্তির দাবীতে উর্ধ্বতন মহলে দেনদরবার চালাচ্ছিলেন বাংলাদেশ বেতার অনিয়মিত শিল্পী কর্মচারী সংস্থা। এ সংগঠনের সভাপতি লিটন মোল্লা ও সাধারন সম্পাদক আবুল কালামও গত ৩ ডিসেম্বর একইভাবে চাকুরীচ্যুত হয়েছেন।
সভাপতি লিটন মোল্লা বলেন, আমিসহ ৯ জন ২০১৭ সালে প্রথম রীট করলে উচ্চদালত আমাদের রাজস্বখাতর্ভূক্ত করতে বাংলাদেশ বেতার কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। বেতার কর্তৃপক্ষ আমাদের যোগদান না নিয়ে নানা তালবাহানা করে ৬ মাস পর রীটের আদেশের বিরুদ্ধে আপীল করেন। পরে আরও ৭১ জন কর্মচারী একই আবেদন জানিয়ে রীট করেন। যার সবগুলোই চলমান থাকা অবস্থায় ৩ ডিসেম্বর ৮০ জনকে একযোগে কর্মস্থলে আসতে মৌখিক নির্দেশ দেয়া হয়। পরদিন থেকে তাদেরকে কেন্দ্রের র প্রধান ফটক থেকে ভেতরে ঢুকতে দেয়া হয়নি।
লিটন মোল্লা অভিযোগ করেন, ২৯৮ জন কর্মচারী নিয়োগ দেয়ার জন্য বেতারের সদর দপ্তর থেকে গত এক বছরে ৩টি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে। প্রতিজন নিয়োগে ১০ লাখ টাকার উর্ধ্বে বানিজ্য করবেন নিয়োগদাতারা। আদালতে নির্দেশে কয়েকটি পদে নিয়োগে ৬ মাসের স্থগিতাদেশ চলছে। অনিয়মিত শিল্পীরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যাতে সেখানে নিয়োগের দাবী তুলতে না পারেন, সেজন্য তাদেরকে চাপে রাখতে ৮০ জনকে মৌখিক আদেশে চাকুরীচ্যুত করা হয়েছে।
মহাপরিচালক নারায়ন চন্দ্র শীলের বক্তব্য প্রসঙ্গে শিল্পী কর্মচারী সংস্থার সাধারন সম্পাদক আবুল কালাম বলেন, অর্থ সংকটের অজুহাত দেখিয়ে শুধুমাত্র যে ৮০ জন রীট করেছেন তাদেরকে কর্মবিরতীতে পাঠানো হয়েছে। এতেই বিষয়টি স্পষ্ট যে, পুরোটায় তাদের সাজানো। মুলত নিয়োগ বানিজ্য সহজ করতে বেতারের কয়েকজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ পদক্ষেপ নিয়েছেন। ##
২০১৯-১২-১৩
