নাগরিক রিপোর্ট : ধান-নদী-খালের দেশ বরিশালের সামনে বড় বিপদ আসছে। জলবায়ু পরিবর্তনে যে বিপর্যয়ের আশংকা করা হচ্ছে তা যদি সত্যি হয় তাহলে বরিশালের অস্তিত্বই থাকবেনা। এ বিপর্যয় মোকাবেলা করতে হলে খাল-নদী দখল ও দূষনের বিরুদ্ধে সরকারী এবং বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে সমম্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বরিশালকে বাঁচাতে দখলদারদের প্রতিরোধ এবং দূষণকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনী ব্যবস্থা গ্রহন করার আহ্বান জানিয়ে বক্তারা বলেন, ‘আমরা দন্তহীন জাতীয় নদী কমিশন দেখতে চাইনা’। বুধবার বরিশালে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) আয়োজিত ‘বরিশালে জলাশয় সুরক্ষা ও সংরক্ষনে করণীয়’ শীর্ষক গণশুনানী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহনকারীরা এ অভিমত দেন।
বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা এবং জেলা প্রশাসকের দপ্তর, পরিবেশ অধিপ্তর ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রতিনিধিরা গণশুনানীতে অংশগ্রহন করেন। এতে সভাপতিত্ব করেন বেলার প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। গণশুনাীতে আমন্ত্রিত অতিথি সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আসেনি। তার কোন প্রতিনিধিও পাঠাননি। জেলা প্রশাসক মো. জসীম উদ্দীন হায়দার, পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন বিশ্বাস এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক আব্দুল আলিম অংশগ্রহন না করে প্রতিনিধি পাঠান। এতে গণশুনাীতে অংশগ্রহনকারীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
বক্তারা অভিযোগ করেন, নগরী ভেতর দিয়ে প্রবাহিত খাল এবং সংলগ্ন কীর্তণখোলা নদী দূষণের জন্য দায়ী বরিশালের কয়েকটি ওষুধ প্রস্তুুতকারী কোম্পানী। পরিবেশ অধিপপ্তরের চাপের মুখে এসব কারখানায় এটিপি (বর্জ্য শোধনাগার) স্থাপন করা হলেও সেগুলো নিয়মিত চালু রাখা হয়না। কারখানা থেকে বর্জ্য সরাসরি কীর্তণখোলায় ফেলা হয়। পরিবেশ অধিদপ্তরে টিম যেদিন পরিদর্শনে যান সেদিন এটিপি চালু রেখে সবকিছু ঠিকঠাক দেখানো হয়। গণশুনানী উপস্থিত পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল মালেক বক্তাদের এ অভিযোগ সত্য বলে স্বীকার করেন। তবে কেমিষ্ট ল্যাবটরিজের জেনারেল ম্যানেজার কাজল ঘোষ ও অপসোনিন গ্রুপের পক্ষে মো. হানিফ এটিপি নিয়ে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
সাংবাদিক ও পরিবেশকর্মী সুশান্ত ঘোষ জানান, সম্প্রতি পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক কীর্তণখোলার একাধিক পয়েন্টের পানি সংগ্রহ করে গবেষনা করেছেন। তাতে দেখা গেছে পানিতে এন্টিবায়েক দুষনের ক্ষেত্রে কীর্তণখোলা নদী পৃথীবির মধ্যে সবচেয়ে ঝুকিপূর্ন। আমেরিকার একটি জার্নালে এ গবেষনার নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তবে এ বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নমত জানিয়ে অপসোনিন গ্রুপের প্রতিনিধি মো. হানিফ বলেন, অ্যান্টিবায়িক দুষন নয়, গত মৌসুমে সাগরের পানি প্রবেশ করায় কীর্তণখোলার পানিতে লবনাক্ততা বেশী পাওয়া গেছে। এজন্য ওষুধ কোম্পানী দায়ী নয়।
বক্তারা অভিমত দেন, নগরীতে দূষন ও জলাবদ্ধতা রোধ করতে সবার আগে জেলখাল সংস্কার করতে হবে। তারা সি.এস পর্চা অনুযায়ী খালের সীমানা নির্ধারনের দাবী জানিয়েছেন। পুকুর ও জলাশয় ভরাট বন্ধে জলশায় রক্ষা আইন শতভাগ কার্যকর করার দাবী জাননো হয়।
গণশুনানী শুরর আগে উপস্থাপন করা তথ্যে জানানো হয়, বরিশাল নগরীতে এখনও ২০০টি পুকুর এবং ২৩টি খালের অস্তিত্ব রয়েছে। তারমধ্যে ৯টি খাল পুরোপুরি মৃত এবং ১১টি অর্ধমৃত।
বরিশালে জলাশয় সুরক্ষা ও সংরক্ষনে ১৩টি সুপারিশমালা উপস্থাপন করা হয়েছে গণশুনানীতে। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- নদী রক্ষায় উচ্চাদালতের রায় বাস্তবায়ন, সি.এস ম্যাপ অনুযায়ী নদীর সীমানা নির্ধারন, দখল-দুষন ও ভরাটে আইনের কঠোর প্রয়োগ, নদী রক্ষা কমিশনের নিয়মিত তৎপরতা, সামাজিক আন্দোলন ও প্রেসার গ্রুপ সক্রিয়া রাখা ইত্যাদি।
গণশুনানীতে অংশগ্রহনকারীদের দাবীর মুখে জেলা পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন বলেন, পরেশসাগরসহ পুলিশ বাহিনীর মালিকানাধীন পুকুরগুলো যাতে সর্বসাধারন ব্যবহার করতে পারে তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন তিনি।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সোহেল মারুফ বলেন, খাল ও জলাশয় রক্ষায় জনগণের চাহিদা অনুযায়ী জেলা প্রশাসকের দপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সভাপতির বক্তব্যে বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, গণশুনানী উঠে আসা অভিমতগুলো জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে দেয়া হবে। কারন জনগণের মতামতগুলো বাস্তবায়ন করার মালিক এই প্রতিষ্ঠানগুলো।##
২০২২-০৩-৩১
