মেঘনার সাগরমুখী মোহনায় আ’লীগ নেতাদের জালের বাঁধ

Spread the love

নাগরিক রিপোর্ট ॥ অবৈধপন্থায় ইলিশসহ সকল প্রজাতির মাছ নির্বিচারে নিধন করতে জালের বাঁধ দিয়ে মেঘনার প্রায় দেড় কিলোমিটার প্রসস্থ সাগরমুখী মোহনা আটকে দেয়া হয়েছে। ভোলার লালমোহন উপজেলা সংলগ্ন মেঘনার একটি মোহনায় বাঁধটি দেয়া হয়। ফলে ওই মোহনা দিয়ে ইলিশসহ সকল প্রজাতির মাছ সাগর থেকে নদীতে প্রবেশের আগেই জালে ধরা পড়ছে। এভাবে প্রতিদিন ২০ লক্ষাধিক টাকার মাছ নিধন করা হয় বলে জানা গেছে।
লালমোহনে ক্ষমতাসীন দলের দুই ইউপি চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে মৎস্য আইনের নীতিমালা উপেক্ষা করে মোহনার মুখ আটকে জালটি পাতা হয়েছে। এ চক্রটি এতটাই শাক্তিশালী যে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অভিযানে গিয়ে জাল কেটে মোহনা উম্মুক্ত করে দেয়ার আবার জাল পাতা হয়েছে। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে চিঠি দেয়া হয়েছে মোহনা উম্মুক্ত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে। অধিদপ্তরের বিভাগীয় উপ পরিচালক ড. ওয়ালিউর রহমান নিজের অসহায়ত্বের কথা জানিয়ে বিভাগীয় কমিশনারের শরনাপন্ন হন।

স্থানীয় সুত্রগুলো জানিয়েছে, লালমোহন উপজেলা সংলগ্ন মেঘনার মঙ্গলসিকদার ঘাট থেকে বাতিরখাল ঘাট পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার প্রসস্ত নদীতে অসংখ্য গাছের খুটা গেড়ে জাল পেতে মোহনার মুখ আটকে দেয়া হয়। মেঘনার দুটি চরের (৮ নম্বর চর নামে পরিচিত) মাঝ দিয়ে এ মোহনাটি সাগরের দিকে প্রবাহিত। ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ওই মোহনা দিয়ে নদীতে প্রবেশ করতে গেলে জালে আটকে যায়।
সুত্রগুলো জানায়, লালমোহনের ধলিগৌরনগর ইউপি চেয়ারম্যান হেতায়েতুল ইসলাম মিন্টু এবং লর্ডহার্ডিজ ইউপি চেয়ারম্যান মো. আবুল কাশেমের নেতৃত্বে মেঘনার মোহনায় এভাবে জালের বাঁধ দেয়া হয়। এর সঙ্গে জড়িত আছেন স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ৫০জন মৎস্য ব্যবসায়ী। যারা সকলে স্থানীয় আওয়ামীলীগের নেতাকর্মী। প্রতিদিন জালে ধরা পড়া ২০ লক্ষাধিক টাকার মাছ (ইলিশসহ অন্যান্য) তাদের মধ্যে ভাগবন্টন হয়। তাদের নেতৃত্বে থাকা দুই ইউপি চেয়ারম্যান আওয়ামীলীগের প্রভাবশালী নেতা এবং জেলেদের স্বার্থ রক্ষার সংগঠন জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতিরও নেতৃত্ব দেন তারা।
স্থানীয় জেলে মো. আলমগীর জানান, জাল দিয়ে মোহনা আটকে দেয়ায় ভোলার চারপাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মেঘনায় এবারের মৌসুমে ইলিশ পাওয়া যায়নি। তিনি গত আগষ্টে জাল অপসারনের জন্য লালমোহন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কাছে আবেদন করেন। প্রশাসন দুইবার অপসারন করার পর আবার জাল পেতে মোহনা আটকে দেয়া হয়েছে।
আলমগীর বলেন, আশি^নের পূর্ণিমায় মা ইলিশ ডিম ছাড়ার জন্য সাগর ছেড়ে মিঠা পানির নদীতে আসে। প্রজনন নিরাপদ করার জন্য আগামী ৯ অক্টোবর থেকে ২২ দিন ইলিশ নিধনে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে মৎস্য অধিদপ্তর। লালমোহনের মোহনায় জালটি বহাল থাকলে সেখান দিয়ে নদীতে প্রবেশ করার আগেই মা ইলিশ জালে আটকে যাবে। এ কারনে জালটি এখন এখন ইলিশ প্রজনের জন্যও হুমকি বলে এ জেলের অভিমত।
লালমোহন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুদিপ্ত মিশ্র বলেন, নদীতে গাছের খুটা দিয়ে ১ কিলোমিটারেরও বেশী জাল পেতে লালমোহন সংলগ্ন মেঘনার একটি মোহনা আটকে দিয়েছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। তিনি ২ বার সেখানে অভিযান চালিয়ে জাল অপসারন করলেও আবার পাতা হয়েছে। মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, এ চক্রটি স্থানীয়ভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট। মৎস্য অধিদপ্তরের আর্থিক ও জনবল সংকট থাকায় তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারছেন না। বিষয়টি অবহিত করা এবং মোহনায় স্থায়ী কোষ্টগার্ড নিয়োগের আবেদন জানিয়ে গত মঙ্গলবার অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর চিঠি দিয়েছেন বলে এ কর্মকর্তা জানান।
লালমোহনের ইউএনও হাবিবুল হাসান রুমি এ তথ্যের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, তিনি গত ২৮ আগষ্ট অভিযান পরিচালনা করে প্রায় দেড় কিলোমিটার প্রসস্থ মোহনায় পাতা জাল কেটে দিয়েছিলেন। এখনকার খবর তার জানা নেই। ইউএনও রুমি জানান, ওই জালের কারনে ইলিশের বিচরন বাঁধাগ্রস্থ হয়। এলাকাটি দূর্গম হওয়ায় সেখানে যোগাযোগ করা দুরুহ। মৎস্য অধিদপ্তর সমম্বিত অভিযান চাইলে আবার সেখানে যাবেন তিনি।
মোহনা আটকে জাল পাতা দলের নেতৃত্ব দেয়া ধলিগৌরনগর ইউপি চেয়ারম্যান হেতায়েতুল ইসলাম মিন্টুর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোবাইলে কল দেয়া হলে তিনি বলেন, এতে মাছের কোন ক্ষতি হয়না। তিনি দাবী করেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যের অনুমতি নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের জন্য এ কাজটি করেছেন। এক পর্যায়ে তিনি সংবাদ না করার প্রস্তাব দিয়ে বলেন, ‘এলাকায় আসেন, খরচপাতি দেয়া হবে, না এলে আগামী সপ্তাহে বরিশালে এসে দেখা করবো’।
বরিশাল মৎস্য অধিদপ্তরের মৎস্য কর্মকর্তা (ইলিশ) বিমল চন্দ্র দাস জানান, সম্প্রতি বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সমম্বয় কমিটির সভায় লালমোহনের মেঘনার মোহনায় অবৈধভাবে জাল পাতার বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। এতে ছোট-বড় সকল মাছ নির্ভিচারে ধ্বংস ও ইলিশ বিচরন বাঁধাগ্রস্থ হচ্ছে। নদীও মরে যাবে। মা ইলিশ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগে সম্মিলিতভাবে অভিযান চালাবেন তারা।
অধিদপ্তরের বিভাগীয় উপ পরিচালক ড. অলিয়ুর রহমান ক্ষুদ্ধ কন্ঠে বলেন, সাগর ও নদীর মিলনমুখে খুটা দিয়ে স্থায়ী জাল পাতায় এবার নদীতে ইলিশ আসতে পারেনি। বিষয়টি নিয়ে মৎস্য অধিদপ্তর কঠোর অবস্থানে থাকলেও তারা কিছুই করতে পারছেন না। সবশেষে বাধ্য হয়ে গত ১৩ সেপ্টেম্বর বিষয়টি বিভাগীয় কমিশনারকে অবহিত করেছেন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য।##

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *