নাগরিক রিপোর্ট ॥ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ববি) দীর্ঘ সাড়ে ৫ মাস ধরে ভিসি’র পদ শুন্য রয়েছে। যেকারনে চরম অস্থিরতা আর কোন্দল দেখা দিয়েছে শিক্ষক, কর্মকর্তাদের মধ্যে। ছাত্ররাও তাদের দাবী পুরন না হওয়ায় হতাশ। ভিসি’র রুটিন দায়িত্বে থাকা ট্রেজারার এমন সব জটিলতা নিয়ন্ত্রনে অনেকটাই হিমশিম খাচ্ছেন। দীর্ঘ মাস ধরে একাডেমিক সভা, অর্থ কমিটির সভা ও সিন্ডিকেট সভা না হওয়ায় স্থবির হয়ে পড়ছে ববি। ভেঙ্গে পড়েছে বিশ^বিদ্যালয়ের চেইন অব কমান্ডও। এদিকে ক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও ভিসির রুটিন দায়িত্বে থাকা ট্রেজারার প্রফেসর ড. এ কে এম মাহবুব হাসানের বিরুদ্ধে প্রায় ১২ কোটি টাকা বিল উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। কোন এখতিয়ার বলে ক্ষমতাহীন ট্রেজারার কোটি কোটি টাকা খরচ করেছেন তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সর্ব মহলে। এ অবস্থায় নবীন এ বিশ^বিদ্যালয়টির অচলায়তন কাটাতে পূর্নাঙ্গ ভিসি দাবী করেছেন ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তারা।
জানা গেছে, আন্দোলনের কারনে চলতি বছরের ২৭ মে দায়িত্ব থেকে বিদায় নেন তৎকালীন ভিসি প্রফেসর ড. এস এম ইমামুল হক। ২৮ মে থেকে ভিসি পদ শুন্য হয়ে পরে বিশ^বিদ্যালয়টিতে। যদিও শিক্ষামন্ত্রনালয় ২৬ মার্চ থেকে টানা ছাত্র আন্দোলনের চাপে গত ১১ এপ্রিল থেকে ২৬ মে পর্যন্ত টানা ৪৪ দিন তৎকালীন ভিসি ইমামুল হককে বাধ্যতামুলক ছুটি প্রদান করে। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে ভিসি’র রুটিন দায়িত্ব প্রদান করা হয় ট্রেজারার ড. এ কে এম মাহবুব হাসানকে। কিন্তু গত সাড়ে ৫ মাসে বিশ^বিদ্যালয় পরিচালনায় অনেকটাই ব্যার্থ হয়ে পড়েছেন তিনি। তার মেয়াদও আগামী ৭ অক্টোবর মেষ হচ্ছে। যেকারনে একাডেমিক ও উন্নয়ন কার্যক্রম যেমন মুখ থুবড়ে পড়েছে, তেমনি শিক্ষক-কর্মকর্তাদের মধ্যেও বিরোধ চরম আকার ধারন করেছে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী ও অফিসার্স এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো: মুরশীদ আবেদীন বলেন, ভিসি না থাকায় বিশ^বিদ্যালয়ের অবস্থা খুবই নাজুক হয়ে পড়েছে। ভেতরে ভেতরে বিরোধ জেঁকে বসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী পরিচালক সুব্রত কুমার বাহাদুরকে গত ২৪ সেপ্টেম্বর লাঞ্জিত করেছেন কর্মকর্তা আতিকুর রহমান। লাঞ্চিতর শিকার সুব্রত রুটিন দায়িত্বে থাকা ভিসির কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। কর্মকর্তা আতিক অনেককেই এভাবে নাজেহাল করছেন ট্রেজারার এর প্রশ্রয় পেয়ে। আতিক টিএসসির দায়িত্বে ছিলেন। অথচ কোন আদেশ ছাড়াই তাকে অর্থ দপ্তরে বসানো হয়েছে। ট্রেজারারের ইশারায় আতিকুর রহমান পছন্দের লোকদের কেবল বিল দিচ্ছেন। অনেকেরই বিল আটকে দিচ্ছেন তিনি। ফাইলও ফেরত পাঠাচ্ছেন নিয়ম বর্হিভূত।
নির্বাহী প্রকৌশলী মুরশীদ আবেদীন বলেন, ট্রেজারার প্রফেসর ড. এ কে এম মাহবুব হাসান রুটিন দায়িত্ব পালন করছেন ভিসির। অথচ ক্ষমতা না থাকা সত্বেও তিনি অনিয়ম করে ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার বিল উত্তোলন করেছেন। যেমন কম্পিউটার, প্রজক্টের ক্রয় বাবদ ৭০ লাখ টাকার বিল করেছেন। রুটিন দায়িত্বে থেকে ড. মাহবুব হাসান কোনভাবেই এমনটা পারেন না। বিশ^বিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আবুল বাশার এর মেয়াদ ৩০ জুন শেষ হয়েছে। অথচ এখনও মন্ত্রনালয়ের অনুমতি ছাড়াই বহাল তবিয়তে রয়েছেন প্রকল্প পরিচালক আবুল বাশার। এমন মারাতœক অনিয়ম ট্রেজারার দেখেছেন না। ফলে উন্নয়ন থমকে রয়েছে। কর্মকর্তাদের এই নেতা বলেন, সম্প্রতি ক্যাম্পাসের দেয়ালে দেয়ালে দেয়ালে কর্মকর্তা-শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ন্যাক্কারজনক মন্তব্য করা হয়েছে। এর কোন বিচার না হওয়ায় শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরোধ ও অস্থিরতা বিরাজ করছে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী পরিচালক (অর্থ) ও অফিসার্স এ্যাসোসিয়েশনের সাধারন সম্পাদক আতিকুর রহমান বলেন, অর্থ শাখায় একটি চিঠি নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়েছে সুব্রতর সাথে। এ নিয়ে আমিও লিখিত দিয়েছি তার বিরুদ্ধে। এর আগেও জীবননাশের হুমকি দেয়ায় আমি জিডি করেছিলাম। তিনি বলেন, অনেকের বিল না ছাড়ার কারন আছে। অনেকটাই ভুয়া বিল। বিশেষ করে নির্বাহী প্রখৌশলী মুর্শিদ আবেদিন অনেক ভুয়া বিল করেছেন। তিনি বলেন, কিছু বিল ছাড়া হচ্ছে, তবে তা বিতর্কিত বিল নয়। তিনি মনে করেন, পুর্নাঙ্গ দায়িত্বের ভিসি থাকলে এমন জটিলতা ও অস্থিরতা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতো না।
শিক্ষা কার্যক্রম ভেঙ্গে পড়ায় শিক্ষকদের মধ্যেও বিরুপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাধারন সম্পাদক সহকারী অধ্যাপক আবু জাফর মিয়া বলেন, পুর্নাঙ্গ ভিসি না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক, অর্থ ও সিন্ডিকেট সভা হয় না দীর্ঘ মাস ধরে। এর ফলে সিলেবাস, ফলাফল কার্যত অনুমোদন দেয়া যাচ্ছে না। খন্ডকালীন শিক্ষকও নিয়োগ হচ্ছে না। অনেকটা জোরাতালি দিয়ে কাজ চলছে। এর ফলে উন্নয়ন থমকে আছে। বিল হচ্ছে না। প্লানিংও হচ্ছে না। সর্বোপরি একটি বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসন, মিশন অচল হয়ে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চেইন অব কমান্ড এমন ভাবে নাজুক হয়ে পড়েছে যে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসের দেয়ালে বাজে মন্তব্য করা হচ্ছে। তিনি বিশ^বিদ্যালয়ের এমন স্থবিরত কাটিয়ে তুলতে একজন পুর্নাঙ্গ ভিসি নিয়োগের দাবী তুলেছেন।
এদিকে নতুন ভিসির দাবীতে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন ছাত্ররাও। তৎকালীন ভিসি বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম ববি ছাত্র মো: লোকমান হোসাইন বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উল্লেখ করেছেন, টানা ৫ মাস উপাচার্যবিহীন বরিশাল বিশ^বিদ্যালয়। দায়িত্ব পালনকারী ট্রেজারারের সীমাবদ্ধতা থাকায় তিনি সকল দায়িত্ব পালন করতে পাড়ছে না। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবী ও বিশ^বিদ্যালয় স্থাপনা সংক্রান্ত কাজ পিছিয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীরাও অনেক কাজে জটিলতার সম্মুখীন হচ্ছে। নতুন উপাচার্য নিয়োগ ব্যাতিতো ববির গতিশীলতা সৃস্টি হবে। না। ওই ছাত্রের এমন স্টেটাস পছন্দ করেছেন ১২৩ জন ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী।
এব্যপারে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি’র রুটিন দায়িত্বে থাকা ট্রেজারা প্রফেসর ড. এ কে এম মাহবুব হাসান বলেন, পুর্নাঙ্গ ভিসি দেয়ার বিষয় সরকারের। তবে তার দায়িত্ব পালনে কোন সমস্যা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীন দ্বন্দ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একজন কর্মকর্তার লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন। পাল্টা অভিযোগও দেয়া হয়েছে। ক্যাম্পাসের দেয়ালে দেয়ালে শিক্ষক, কর্মকর্তাদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেগুলো দেয়াল থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। শিক্ষক, কর্মকর্তাদের মধ্যে এমন বিরোধ তিনি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ না করারও অনুরোধ জানান। ট্রেজারার বলেন, বিল দেয়ার বিষয়ে নানা বাধ্যবাধকতা ও আইন আছে। যেসব বিল দেয়া হয়েছে তা নিয়ম অনুযায়ী। প্রকল্প পরিচালকের মেয়াদ শেষ হলেও পদে বহাল থাকা প্রসঙ্গ তিনি এড়িয়ে গেছেন।
সম্মিলিত সামজিক আন্দোলন বরিশাল জেলা সাধারন সম্পাদক কাজী এনায়েত হোসেন শিবলু বলেন, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় বরিশালবাসীর আন্দোলনের ফসল। তার কন্যাও এই বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। কিন্তু এখানে এখন নানা শ্রেনীর মানুষ এসে রাম রাজত্ব চালাচ্ছে। যারা এখন দায়িত্ব পালন করছেন তারা শিক্ষার দিকে মনোযোগ না দিয়ে অর্থ ভাগভাটোয়রায় ব্যস্ত। এর প্রভাব পড়ছে ছাত্র-ছাত্রীদের উপর। বিশ্ববিদ্যালয়ের অচল অবস্থা কাটাতে তিনি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
২০১৯-০৯-২৮
